চাকরির নিরাপত্তা নেই কারখানার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের, দেখার কেউ নেই

আব্দুল আলিম : গতরাত ১১.৩০ মিনিটে খন্দকার নাজমুল ইসলাম নামের এক ভদ্রলোকের সাথে হাটছিলাম। হঠাৎ একটি ফোন কলে উনি অত্যন্ত নরম সুরে শুধু “স্যার স্যার” উচ্চারণ করছিলেন। বুঝা যাচ্ছিল কাউকে ম্যানেজ করছেন। ফোন রেখেই আরেকটি ফোন করে আরেকজনকে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। বুঝতে আর বাকি রইল না যে তিনি তাঁর কোন অধিনস্তের সাথে কথা বলছিলেন। তিনি হলেন আমাদের অর্থনীতির চালক পোশাক খাতের কোন এক কারখানার বড় এক কর্মকর্তা। এভাবেই দিনরাত মেধা, শ্রম আর সময় দিয়ে যাচ্ছেন আমাদের পোশাক খাতের প্রায় ২/৩ লক্ষ কর্মকর্তা যাদের শ্রমের কথা কেউ কখনো বলে না। কেউ কখনো জানতে চান না, কেমন আছেন তারা?

কোন এক কমপ্লায়েন্স কারখানায় কাজ চলাকালিন শ্রমিকদের মোবাইল ব্যবহার করতে দেয়ার দাবিতে আন্দোলন। এক দাবি থেকে কয়েক দফা দাবি। মালিক অধিকাংশ দাবি মেনে নিয়ে শান্ত করলেন শ্রমিকদের। দুদিন পরে একজন ফোনে জানালেন সেই কারখানার কমপ্লায়েন্স ম্যানেজারের চাকরি নেই। ফোনে জানতে চাইলাম কিন্তু তিনি অভিযোগ করতেও সাহস পেলেন না। অথচ তার মাথায় পুরো কারখানার শ্রমিক অধিকার রক্ষার দায়িত্ব ছিল। তিনিই তো এতদিন অডিটর এর চোখ ফাঁকি দিয়ে অডিট পাস করাতে মশগুল ছিলেন, তিনিই হয়তো নতুন বায়ার এর কারখানা ভিজিট করবে জেনে দিনরাত শ্রম দিয়ে কারখানাকে বউ সাজ সাজিয়ে বায়ারকে সন্তুষ্ট করতে ছিলেন অস্থির।

শ্রমিকের কথা বলতে আছে শ্রমিক সংগঠন (যদিও অধিকাংশ শ্রমিক সংগঠন শ্রমিকের স্বার্থে কাজ না করে নিজেদের স্বার্থে কাজ করেন বলে অভিযোগ আছে), মালিকের স্বার্থে আছে মালিক সংগঠন কিন্তু শীল-পাটার মাঝামাঝি অবস্থান করা এই কর্মকর্তাদের স্বার্থে কথা বলার কেউ নেই। শুধুই আছে লাঞ্ছনা। মালিক অন্যায় আদেশ দেন শ্রমিকের অধিকার হরণের, বিবেকের সাথে আপোষ করে, চাকরি রক্ষার তাড়নায় কখনও কখনও তাঁর কলমেই অধিকার হারান শ্রমিক। আর সে কারনে কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ। মালিক বলে তুমি অযোগ্য তাই সামলাতে পার না আর শ্রমিক বলে মালিক ভাল ওই ম্যানেজার আমাদের অধিকার কেড়ে নিয়েছে। মালিক শ্রমিক সমঝোতা হলেও ব্যর্থতার দায়ভার নিতে হয় সেই ম্যানেজারকেই।

শ্রমিকদের সময়মত বেতন দেয়ার জন্য মালিকরা প্রাণপণ চেষ্টা করেন। ইচ্ছে করে শ্রমিকের বেতন দিতে দেরি করে কারখানার সুনাম নষ্ট করতে কেউ চান না। চান না অযথা ঝামেলায় জড়াতেও। তবে আমাদের পোশাক খাতের অধিকাংশ কারখানার কর্মকর্তা সময়মত তাদের বেতন পান না। মালিকের সমস্যার যেহেতু কোন শেষ নেই তাই প্রতি মাসেই তাদেরকে শুনতে হয়, “আগে শ্রমিকদের বেতনটা দিয়ে নেই তারপর আপনাদের কথা ভাবছি” অনেক সময় কয়েক মাসের বেতন থেকে যায় বকেয়া আর চাকরি থেকে ইস্তফা দিলে সেই টাকা কমই কপালে জোটে।

শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার্থে আছে শ্রম আইন। আইএলও সহ নানা দেশি ও বিদেশি আইনে ৮ ঘন্টা সাধারণ কর্মদিবস। আট ঘন্টার স্থলে বেশি কাজ করতে হলে তারা অধিক কাল কাজ করার জন্য পাবেন অতিরিক্ত ভাতা। ছুটির দিনে কাজ করলেও পাবেন অতিরিক্ত ভাতা। তবে খন্দকার নাজমুল সাহেবদের মত কর্মকর্তারা কারখানায় ১২ ঘন্টা কাজ করার পর চলার পথে মালিকের ফোন আর ফোনের নির্দেশনা মত ম্যানেজ করতে চেষ্টা করছেন তার অধিনস্তদের। ঘুমের মধ্যে হঠাৎ কল বা স্মার্ট ফোনে জরুরি ইমেইল। ভাল কোন খবর নয়, ইন্সপেকশন ফেল করেছে। মালিকের মাথা গরম। হয়তো কারো উইকেট পড়ে যাবে (চাকরি চলে যাবে)। পরেরদিন শুক্রবার, মিসেস কে নিয়ে ডাক্তার এর কাছে যাওয়ার কথা। কিন্তু কিসের ডাক্তার; কিসের কি? চাকরি ঠেকানোই যে দায়। নাইট করে হোক আর কারখানায় রাত্রিযাপন করেই হোক সকল ঝামেলা মিটিয়েই বাড়ি ফিরতে হবে। ঝামেলা মেটাতে ইন্সপেক্টর কে স্যার স্যার বলে মুখে থুতু এসে যায় কিন্তু বিধি বাম, আবার ইন্সপেকশন ফেল। অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক দূরে থাক, ছুটির দিনে কাজ করার জন্য ধন্যবাদ দূরে থাক, পরদিন সকালে গিয়ে শুনে কোয়ালিটি ম্যানেজার সহ কয়েকজনের চাকরি নাই। এটা কোন বানানো গল্প নয় এটাই বাস্তবতা। কোন প্রতিবাদ না করে পরদিন শুভাকাঙ্খিদের কাছে একটা চাকরির আবেদন আর চোখ মুখে শুধুই অন্ধকার।

হঠাৎ এক সকালে একটি ফোন, কোন এক কমপ্লায়েন্স কারখানায় কাজ চলাকালিন শ্রমিকদের মোবাইল ব্যবহার করতে দেয়ার দাবিতে আন্দোলন। এক দাবি থেকে কয়েক দফা দাবি। মালিক অধিকাংশ দাবি মেনে নিয়ে শান্ত করলেন শ্রমিকদের। দুদিন পরে একজন ফোনে জানালেন সেই কারখানার কমপ্লায়েন্স ম্যানেজারের চাকরি নেই। ফোনে জানতে চাইলাম কিন্তু তিনি অভিযোগ করতেও সাহস পেলেন না। অথচ তার মাথায় পুরো কারখানার শ্রমিক অধিকার রক্ষার দায়িত্ব ছিল। তিনিই তো এতদিন অডিটর এর চোখ ফাঁকি দিয়ে অডিট পাস করাতে মশগুল ছিলেন, তিনিই হয়তো নতুন বায়ার এর কারখানা ভিজিট করবে জেনে দিনরাত শ্রম দিয়ে কারখানাকে বউ সাজ সাজিয়ে বায়ারকে সন্তুষ্ট করতে ছিলেন অস্থির।

কারখানার এইচআর ম্যানেজার, যিনি সাক্ষর করে সকল শ্রমিকের নিয়োগ দেন আবার তিনিই কখনো গ্রহণযোগ্য আবার কখনো মালিকের আদেশে কাউকে চাকরী থেকে বরখাস্ত করেন। বরখাস্তকৃত শ্রমিক শ্রম আদালতে গিয়ে মামলা ঠুকে দেন এইচআর ম্যানেজারের নামে। মামলার হাজিরা শেষ হবার আগেই চোখের নিমিষে তিনিই চাকরি হারিয়ে ফেলেন। এবার আর মামলা অভিযোগ না করে মাথা নিচু করে বের হয়ে এসে চোখে মুখে অন্ধকার নিয়ে খুঁজে ফেরেন আরেকটি চাকরি।

আজকের অ্যাকর্ড/এলায়েন্স/বিএসসিআই সহ নানা বায়ার এর নানা চাহিদা পুরণ করতে পাগল প্রায় অবস্থা আডমিন/কমপ্লায়েন্স ডিপার্টমেন্ট এ চাকরি করা কর্মকর্তাদের। সব সময় মালিক পক্ষ যথেষ্ট সাপোর্ট না দিলেও অডিট চাই পাস। আর অডিট পাস করলে বিন্দু মাত্র ধন্যবাদ না জূটলেও অডিট ফেল করার পরের দিন চাকরী চলে যাবার ঘটনা শত শত। কখনও কখনও আবার অডিট পাস করেও চাকরী থাকেনা কারন অডিট পাস করার পরে আর তাঁর কোন দরকার নাই। যারা শ্রমিক অধিকারের মন্ত্র আওরান সব সময়, যারা নানা কৌশল করে অডিট পাসের আপ্রাণ চেষ্টা করে যান সেই লোকদের চাকরির নেই কোন নিরাপত্তা। নেই কোন ওভার টাইম ভাতা বা অন্যান্য সুবিধা। যারা বস্তিতেও থাকতে পারেন না আবার ভাল বাসায় থাকার সামর্থ্য রাখেন না, যারা তাদের কষ্টের কথা মুখ ফুটে বলতেও পারেনা। কিন্তু কেউ নেই তাদের পক্ষে কথা বলারও।

লেখক : সম্পাদক, দি আরএমজি টাইমস

Share on Facebook13.6kShare on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn12Pin on Pinterest0Print this page