অ্যাকর্ডের মেয়াদ বাড়ানোর পাঁয়তারা; জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজন সরকারের কঠোর ভূমিকা

আব্দুল আলিম : বাংলাদেশের পোশাক কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০১৩ সালে ৫ বছর মেয়াদের জন্য ইউরোপিয়ান ক্রেতাদের উদ্যোগে গঠিত হয় অ্যাকর্ড। এরই ধারাবাহিকতায় গত তিন বছর ২০০ ক্রেতা সদস্যভুক্ত ১৬৪৬ তালিকাভুক্ত কারখানায় কাজ করছে। এর মধ্যে ১৫৪১ টি কারখানার প্রাথমিক পরিদর্শন শেষ করেছে। এসব কারখানা অ্যাকর্ড এর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছে। গত তিন বছরে বেশ কিছু কারখানা তাদের কাজ শেষ করেছে। অনেক কারখানার কাজ শেষ পর্যায়ে ও নতুন কিছু কারখানা তালিকাভুক্ত হওয়ায় তাদের প্রাথমিক পরিদর্শন এখনও শেষ হয় নি। চুক্তি অনুযায়ী ২০১৮ সালেই শেষ হয়ে যাবে অ্যাকর্ড এর মেয়াদ, আর তাই অ্যাকর্ড আলোচনা শুরু করেছে মেয়াদ বাড়ানোর।

কারখানার উন্নয়ন কাজ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। প্রতিটি নতুন দিনে কারখানার যেমন নতুন সমস্যা থাকে তেমনি সমাধানে নতুন নতুন ধারনার ব্যবহার হয়। ফায়ার ও ইলেক্ট্রিক্যাল এ অনেক সমস্যা ইতিমধ্যে সমাধান হয়ে গেলেও কারখানাগুলি একটু পিছিয়ে আছে বিল্ডিং এর রেক্টিফিকেশন নিয়ে। আর এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক যে একটি নির্মিত বিল্ডিং এর রেক্টিফিকেশনের কাজ একটু কঠিন ও সময়সাপেক্ষ।

কিন্তু প্রশ্ন হল, অতি ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলিতো ইতিমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে এবং বাকি কারখানাগুলি তাদের কাজ করে যাচ্ছে এবং ২০১৮ সাল পর্যন্ত অ্যাকর্ড এর হাতে সময়ও আছে তাদের তদারকি করার। নতুন কারখানা তালিকায় যুক্ত হতে থাকবে আর অ্যাকর্ড তাদের সময় বাড়াতে থাকবে এমন চললে তো আমরা আবার নীল চাষে ফেরত যাব। দেশ আমাদের, কারখানা আমাদের আর বড় কর্তারা উড়ে এসে যা ইচ্ছে তাই করবে আর যতদিন খুশি ততদিন থাকবে তা কি করে হয়। উন্নয়নশীল দেশ হতে মধ্যবিত্তের পথে বাংলাদেশ কারখানা নিরাপত্তার জন্য বাকি তদারকির কাজ চালিয়ে নিতে সক্ষম। তারপরও নিয়মিত আছে নানা ধরনের কমপ্লায়েন্স অডিট যেখানে শ্রমিকদের নিরাপত্তাও অডিটের অংশ। জরুরী প্রয়োজনে আমাদের একটি র‌্যাপিড একশন প্রয়োজন ছিল তাই অ্যাকর্ড/এলায়েন্স এর মত উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানিয়েছিলাম। তাই বলে আমার স্বাধীন সার্বভৌম দেশে একটি চুক্তির ভিত্তিতে কোন প্রতিষ্ঠান যুগ যুগ ধরে আমাদের পোশাক খাতকে শাসন করতে পারে না। আমরা এখন একটা পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি যে অনেক বিদেশী ক্রেতারা বলেন বাংলাদেশের কারখানা এশিয়ার মধ্যে সেরা পোশাক কারখানা। ইদানিংকালে গড়ে উঠা সকল কারখানা আইন মেনে তৈরি হচ্ছে। অনেক গ্রীন কারখানা গড়ে উঠছে। তাহলে আপনাদের থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা কেন?

কারখানার পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অ্যাকর্ড এর অনেক সদস্য এর মেয়াদ বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলছেন বলে নির্বাহী পরিচালক রব ওয়েস জানালেও বিভিন্ন আলোচনায় অ্যাকর্ড সদস্যদের এর মেয়াদ না বাড়ানোর পক্ষেও মতামত শোনা যায়।

বাণিজ্যমন্ত্রী বিভিন্ন সময় বলেছেন ২০১৮ এর পরে আর অ্যাকর্ড/এলায়েন্স নয়। বিজিএমইএ ইতিমধ্যে অ্যাকর্ড/এলায়েন্স পরবর্তী তদারকি কাজের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সেখানে অ্যাকর্ড এর মেয়াদ বাড়ানোর আলোচনা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? দুনিয়ার অনেক দেশ দেখার সূযোগে দেখেছি অনেক কারখানাও। যারা কারখানা শব্দটি বুঝে তারা বুঝবে এখানে দৈনন্দিন কিছু সমস্যা থাকবেই। আজকের সমস্যা সধান হলে কালকে আরেকটি সমস্যা আসবে। সমস্যা আসবে সমাধান হবে, তবে সেটা দেশের প্রশাসনিক অবকাঠামো দিয়েই করতে হবে। আমেরিকার পোশাক কারখানায় পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড হয়েছিল বলে কি সে দেশের সকল কারখানা অনিরাপদ বলা হয়েছে? ইউরোপ/আমেরিকার সকল কারখানা কি ১০০ ভাগ নিরাপদ? আমরাতো ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ড সহ নানা দেশে বন্ডেড লেবার/আধুনিক দাসত্ববাদের খবর পাচ্ছি। খবর পাচ্ছি আমেরিকার কারখানাগুলি ন্যূনতম বেতন দিচ্ছেনা শ্রমিকদের। ইউরোপের যে শহরে অ্যাকর্ড এর সদর দপ্তর সেই শহরের কোন এক বাজেট হোটেলে চেক ইন করেছিলাম অভিজ্ঞতার অভাবে বুকিং ডটকম এর কল্যাণে, দেখেছি কাঠের নির্মিত সিঁড়ি ১২-১৮ ইঞ্চির বেশি হবেনা। আমার মত মানুষ সোজা হয়ে হেঁটে উঠার কোন উপায় ছিল না। এই প্রশ্ন করলেই তারা বলবে, পুরানো শহর তো তাই। তাহলে কি পুরানো শহরে মানুষের নিরাপত্তা থাকতে নেই?

বাংলাদেশের তৈরী পোশাক বিশ্বের বাজারে ব্যাপক সুনাম অর্জন করছে, বিশ্বের দ্বিতীয় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জয়জয়কার সর্বত্র। দেশের রপ্তানি আয়ে পোশাক রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধির হার বাড়ছে ক্রমাগতভাবে। লক্ষ্য এখন ২০২১ সালে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পোশাক রপ্তানির। পোশাক রপ্তানির আয় যোগ হয়ে দেশের অর্থনীতি এগিয়ে চলেছে এক দুর্দান্ত গতিতে। এখুনি সময় বিদেশী এসব ষড়যন্ত্র রুখে দেয়ার। শুধুমাত্র অ্যাকর্ডের প্রভাবে ইতিমধ্যে প্রায় অর্ধশতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কর্মহীন হয়েছে হাজার হাজার শ্রমিক। দেশের অনেক কমপ্লায়েন্স কারখানাও বন্ধ হয়ে গেছে। ক্রেতাদের থেকে অর্ডার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে একের পর এক কারখানা। পথে বসে যাচ্ছে কারখানা মালিকরা। এভাবে চলতে থাকলে স্থবির হয়ে যাবে পোশাক রপ্তানি আয়ে সমৃদ্ধ দেশের অর্থনীতির চাকা। এদেশের পোশাক শিল্পের উন্নয়নে অ্যাকর্ডের ভূমিকা আছে বলে মনে করি না। বরং ষড়যন্ত্রের জালে আটকে যাচ্ছে আমাদের শিল্প মালিকরা। অ্যাকর্ডের সময়সীমা বাড়ালে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাবে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প খাতের উন্নয়নে বিদেশী কোনো নজরদারী প্রতিষ্ঠানের দরকার নেই। পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের নিরাপত্তা দিতে দেশের কলকারখানা অধিদপ্তরই যথেষ্ট। দরকার শুধু সরকার ও সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সতর্ক নজরদারী ও দায়িত্ব পালনে আন্তরিকতা। বর্তমানে এদেশের পোশাক খাতে সব ধরনের বিধিবিধান আসছে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের দিক থেকে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, এই দায়িত্ব শুধুই সরকারের।’ আমরা আশা করি, দেশের পোশাক শিল্প ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার্থে সরকার আরও দায়িত্বশীল হবে, অ্যাকর্ডের সময়সীমা না বাড়াতে সরকার কঠোর ভূমিকা পালন করবে।

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দি আরএমজি টাইমস

Share on Facebook4.7kShare on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0Print this page