ঢাকা বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৮, ২০১৯



সাফল্যের চূড়ান্ত সিঁড়ি

মোঃ সাহাব উদ্দিন: মি.আলী একটি তৈরী পোশাক কারখানাতে দীর্ঘ বিশ বছর ধরে কর্মরত ছিলেন। তার কর্মজীবনে তিনি কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর থেকে দুই ধাপ এগিয়ে কোয়ালিটি কন্ট্রলার হতে পেরেছিলেন। হঠাৎ তিনি বয়সের ভারে গুরুতর অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। সবারই জানা কারখানার মালিক এখানে ব্যবসা করতে এসেছে, মানবতার বা আবেগের তেমন একটা ঠাই নাই। যতদিন মেধা ও পরিশ্রম আছে ততদিনই মালিকের কাছে মুল্যায়ন আছে। যেহেতু কাজ করতে অক্ষম সেহেতু কি আর করার – কিছু সার্ভিস বেনিফিট দিয়ে গুডবাই। আসলে বিশ বছর কর্মজীবনে তিনি দুটি পদোন্নতিও পেয়েছিলেন। একজন কোয়ালিটি কন্ট্রলারের বেতন কত হতে পারে সবারই জানা । তিনি কি তার বিশ বছরের কর্মজীবনে সফলতা অর্জন করতে পেরেছিলেন ? এটাকে কি সফলতা বলে ?

পক্ষান্তরে একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মি. হোসেন সাত বছরের মাথায় কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর থেকে কোয়ালিটি ম্যানেজার হিসেবে এখনও কর্মরত রয়েছেন। সাত বছর কর্মজীবনে একজন শ্রমিক থেকে ব্যবস্থাপক পদে উন্নিত এটাকেও কি সফলতা বলে? অবশ্যই সফলতা বলে কেননা যিনি বিশ বছর কর্মজীবনে সফলতার সূচনালগ্নে পড়েছিলেন অথচ তিনি সাত বছরের মাথায় সফলতার চূড়ান্ত সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে উপরের দিকে উঠেই চলেছেন। দেখা যাক কি রহস্য সফলতার? সফলতা অর্জন করতে হলে সাফল্যের পাঁচটি (ব্যক্তিগত অভিমত) সিঁড়ি অতিক্রম করতে হয়। সিঁড়িগুলোকে ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা করা হল:

ক) স্বপ্ন: স্বপ্ন বলতে আমরা কি বুঝি ? মি. দ্বীপ একটি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত আছেন। রাতে ঘুমের মাঝে দেখলেন তিনি ফ্যাক্টরী ম্যানেজার হিসেবে অফিসে বসে আছেন। অফিসের দরজার বাইরে বিভিন্ন সেকশনের অপেক্ষমান কর্মীরা দাঁড়িয়ে আছেন ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করার জন্য। সবাই রুমের ভিতর আসলেন এবং সবাই তার সাথে ঈদের কুশল বিনিময় করছেন । হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে দেখলেন তিনি বিছানায় শুয়ে আছেন-সাধারনত এটাই স্বপ্ন হিসেবে মনে করা হয়। প্রকৃতপক্ষে স্বপ্ন বলতে বুঝায়- যা মানুষকে ঘুমাতে দেয়না, সারাক্ষন মনের বাড়িতে বিচরণ করে। স্বপ্ন থাকতে হবে বড় হবার, ভালো কিছু করার। কারণ, আমার দিকে তাকিয়ে থাকে আরও কয়েকটি মুখ, আমার স্বপ্নের ওপর নির্ভর করে আরও বেশ কিছু স্বপ্ন।

খ) সঠিক পরিকল্পনা: মি. চৌধুরী বত্রিশ তলায় তার অফিস। সকালে অফিসে যাওয়ার জন্য লীফ্ট এর কাছে আসলেন। লীফ্টের পাশে অনেক বড় করে লিখা যাত্রিক ত্রুটির কারনে লীফ্ট বন্ধ আছে । জরুরী কাজ অফিসে যেতেই হবে। কি আর করার তিনি সিঁড়ি দিয়ে অফিসে যাওয়ার সিন্ধান্ত গ্রহন করলেন এবং যাওয়া শুরু করলেন। একতলা থেকে বত্রিশ তলায় যাওয়া কতটুকু কষ্টের কাজ আন্দাজ করতেই পারছেন। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অবশেষে তিনি ৩২ তলায় পৌছে গেলেন। একজন অশিক্ষিত লোকের সামনে অনেক বড় করে লিখা থাকলেও পড়া যেমন তার জন্য অনেক কঠিন ব্যাপার ঠিক একতলা থেকে ৩২ তলায় উঠাও কোন অংশে কম নয়! কষ্ট মাখা হাসি দিয়ে অফিসের তালা খুলতে গিয়ে দেখলেন তালা খোলার জন্য যে চাবি দরকার সে চাবি ভুলক্রমে বাসায় রেখে এসেছেন! এখন বলুন তার অবস্থা কেমন হতে পারে ? যে কোন কাজের পূর্বে একটি সুষ্ঠ পরিকল্পনা দরকার। মি.চেীধুরীর অফিসে আসার পূর্বেই চিন্তা করা দরকার ছিল যেকোন প্রতিকুল পরিবেশের সম্মুখীন হতে পারে যেমন- রাস্তায় গাড়ী না পাওয়া,প্রচুর রৌদ্র,বৃষ্টি, কুয়াশা, ঝড়, বজ্রপাত সর্বোপরি তাকে অফিসে যেতেই হবে। অফিসে যাওয়ার জন্য অফিসের আই.ডি কার্ড, কলম, অফিসের চাবি, ফাইল, মোবাইল ইত্যাদি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ঠিক মত নেওয়া হয়েছে কিনা পূর্ব পরিকল্পনা করেই অফিসে যাওয় উচিত ছিল। একটি সুষ্ঠ পরিকল্পনা কিভাবে করবেন- ধরুন আগামী মাসে কর্তৃপক্ষ এক লাখ পিস টি-শার্ট উৎপাদন করার টার্গেট দিয়েছে। টার্গেট পূর্ণ করার জন্য নির্দিষ্ট বিভাগের কর্মীদের নিয়ে প্রি-প্রোডাকশন মিটিং করে ম্যানপাওয়ার কত, মেশিন কতগুলো লাগবে, ঘন্টা, দিন, সপ্তাহ সর্বোপরি মাস শেষে উৎপাদন কত হবে এবং উৎপাদনের সাথে জড়িত অন্যান্য জিনিসপত্র ঠিক আছে কিনা ও যার যার দায়িত্ব বন্টন করে দিয়ে টার্গেট পূর্ণ করা লক্ষ্যে নিয়ে মাঠে নামার নামই সুষ্ঠ পরিকল্পনা।

গ) গোল সেট-আপ: আবেগের কোন স্থান না দিয়ে বাস্তবতার কথা চিন্তা করে , বর্তমান পদবী অফিসার এর কথা মাথায় রেখে বাস্তবতার আলোকে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন ২০৩৫ সালের মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানের জেনারেল ম্যানেজার (জি.এম) হিসেবে নিজেকে দেখতে চান। ইতোমধ্যে আপনি প্রথম সিঁড়ি (স্বপ্ন) এর কাজ অতিবাহিত করে দ্বিতীয় সিঁড়ি (সঠিক পরিকল্পনা) এর কাজও শেষ করে ফেলেছেন। এখন প্রশ্ন হল আপনি তৃতীয় সিঁড়ির কাজ কিভাবে করবেন ?
২০১৮ সালে আপনি অফিসার পদে কর্মরত আছেন ২০৩৫ সালের মধ্যে আপনাকে জি.এম হতেই হবে এর কোন বিকল্প নেই অথ্যাৎ বসন্ত আসুক বা নাহি আসুক ফুল ফুটবেই কেননা হাতে আছে মাত্র ষোলটি বছর । আপনার গোল বাস্তবায়নের জন্য তিনটি স্তরের উপর মনোযোগ বাড়াতে হবে: ১) বছর বা সাল, ২) প্রত্যাশিত বেতন ও ৩) পদবী ।

গোল সেট-আপের নমুনা:

উপরের ছকটি দেখে অনেকের মদ্ধে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরী হতে পারে যা সকলেরই জানা-প্রো-অ্যাকটিভ ও রি-অ্যাকটিভ। যারা প্রো-অ্যাকটিভ তারে জন্য এই গোল বাস্তবায়ন করা সম্ভব আর যারা সর্বদা রি-অ্যাকটিভ মানসিকতা পোষণ করেন তাদের জন্য অসম্ভব। মনে রাখা দরকার- চাওয়া যদি নিখুঁত হয়, পাওয়াও সুনিশ্চিত হয়ে যায়।

ঘ) শ্রম, জ্ঞান ও দক্ষতা: মি. আলী এবং মি.হোসেন দু’জন এক সঙ্গে একতলা থেকে পাঁচতলা পর্যন্ত সিঁড়ি বেয়ে পায়ে হেটে যাওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হল। মি. আলী প্রতিটি সিঁড়ির উপর পা দিয়ে ঠান্ডা মাথায় আস্তে আস্তে হাটা শুরু করলেন অপরদিকে মি.হোসেন দুইটি সিঁড়ি লাফ দিয়ে উঠে শরীরের ঘাম ঝরিয়ে অতিদ্রুত হাটা শুরু করলেন। স্বাভাবিক ভাবেই মি. হোসেন মি. আলীর চেয়ে তিনগুন সময় কম নিয়ে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছে গেলেন। পরিশ্রম ছাড়া কেউ কি কখনো সফলতার মুখ খেতে পেরেছে ? সারাদিন কাজ করলাম কিন্তু শরীরের ঘামই ঝরলো না এই পরিশ্রমের কোন মূল্য আছে ? পরিশ্রমই এনে দিতে পারে সফলতার চূড়ান্ত সিঁড়ি।

দোলনা থেকে কবর পর্যন্তই জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব যদি ইচ্ছা শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটে। যে যে সেকশনই কর্মরত থাকুক না কেন ঐ বিষয়ে দেশে বই, সেমিনার, ওয়ার্কশপ, প্রশিক্ষনের অভাব নেই শুধু থাকতে হবে জ্ঞান অর্জন করার মানসিকতা। স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানে, সমাজে, রাষ্ট্রে তাকেই কেবল মূল্যায়ন করা হয় যে জ্ঞানী। যার জ্ঞানের আলোয় সবাই উদ্ভাষিত হতে পারে । যার প্রতি মানুষ ভরসা রাখতে পারে। প্রতিটি ক্ষেত্রে জ্ঞানীরা যতদ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে পারে তা অন্য কারো পক্ষে অসম্ভব। জ্ঞানীরাই কেবল প্রতিষ্ঠানে, সমাজে, রাষ্ট্রে গুণীজন। তাদের জ্ঞানেই সবাই হয় গুণান্তিত।

দক্ষতা ছাড়া কেউ কখানো উপরের সিঁড়িতে উঠতে পারে না। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে দক্ষতা অর্জন করতে হয়। অনেক সময় দেখা যায় উপরের বসেরা কাজ দিলে মনে হয় এটা আমার কাজ না, আমার হাতে সময় নেই, আমার অনেক কাজ জমা আছে, আমি এক হাতে কয়টা কাজ করব এভাবেই নানা ধরনের অজুহাত দাঁড় করে থাকি। যদি এতো কথা না ভেবে কাজটি করে ফেলতাম তাহলে হয়ত আমার একটু সময় ব্যয় হত, একটু পরিশ্রম হত, একটু মাথা ঘামাতে হত, সর্বোপরি কাজটা হয়েও যেত। ফলে আমি মাঝখান থেকে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করে ফেলতাম। পরিশ্রম, জ্ঞান ও দক্ষতা একই সুতোঁই গাঁথা। সফলতার অর্জনের জন্য প্রচুর পরিশ্রম, বিশেষ জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন আবশ্যক।

ঙ ) সাফল্য:  সফলতার শেষ বলে কিছু নাই। একটি ভাবনা প্রায় সকলের মাথায় ঘোরপাক খায় তা হল- এক সঙ্গে লেখা-পড়া, খেলাধুলা, গান-বাজনা, আড্ডাবাজি সবই করলাম অথচ মি. হোসেন ডাক্তার, মি.খান প্রকৌশলী, মি.চৌধুরী ম্যানেজার, এই নিয়ে সারাদিন হাই আর হুতাশ । কিন্তু যে বন্ধুগুলো আজ ডাক্তার, প্রকৌশলী, ম্যানেজার তাদের স্বপ্ন কি ছিল, তাদের পরিকল্পনা কেমন ছিল, তাদের ভিশন-মিশন ও লক্ষ্য কি ছিল, তারা সারাদিন কতটুকু পরিশ্রম করত, কি পরিমান অধ্যায়ন করত একবারো কি ভেবে দেখেছি ? আজ শুধু হাই আর হুতাশ! আমিও পারতাম যদি ওদের মত করে ভাবতাম তাহলে আমিও আজ সফলতার সিঁড়ি বেয়ে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারতাম। বিজয়ীরা একই কাজ একটু ভিন্ন ভিন্ন ভাবে করে থাকে। সফল ব্যক্তিরা সদা-সর্বদা সকল প্রতিকুল পরিবেশেও প্রো-অ্যাকটিভ থাকে। তাদের স্বপ্ন, পরিকল্পনা, লক্ষ্য, দক্ষতা ও তাদের সফলতার সিঁড়ি একটাই- ‘সফল হতেই হবে’।

লেখক- মো: সাহাব উদ্দিন, হেড অব এইচ আর

মুরানো টেক্স, ভালুকা, ময়মনসিংহ।


আর্কাইভ